সন্তান লালন-পালনে নবীজী (সা.)-এর যুগ সেরা কিছু নির্দেশনা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম,

প্রিয় পাঠক- আসসালামু আলাইকুম, ইসলামে পরিবারকে সন্তানের প্রাথমিক স্কুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। নবীজি (সা.) এক হাদীসে বলেছেন, “প্রতিটি শিশু জন্মগতভাবে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের সহজাত স্বভাব (ফিতরাত) নিয়ে জন্মায়, কিন্তু পরিবেশ ও পিতা-মাতার প্রভাবে তারা পরবর্তীতে ইহুদী, খ্রিস্টান বা অন্য পথের অনুসারী হয়”। সহীহ বুখারী (১৩৫৮) ও মুসলিম (২৬৫৮)

সন্তান-লালন-পালনে-নবীজী-(সা.)-এর-যুগ-সেরা-কিছু-নির্দেশনা

অর্থাৎ শিশুর আদিম প্রকৃতি নিষ্পাপ এবং সৎ চরিত্র নিয়েই শুরু হয়; তাই পিতা-মাতার আদর্শ আচরণ ও প্রশিক্ষণই শিশুর চারিত্রিক ভিত্তি গঠন করে। তাই আজকে এই আর্টিকেলের আলোচনার বিষয় হচ্ছে, ‘সন্তান লালন-পালনে নবীজী (সা.)-এর যুগ সেরা কিছু নির্দেশনা’

পেজ সূচিপত্রঃ সন্তান লালন-পালনে নবীজী (সা.)-এর যুগ সেরা কিছু নির্দেশনা

সন্তান লালন-পালনে নবীজী (সা.)-এর যুগ সেরা কিছু নির্দেশনা

দুনিয়াতে সন্তান হলো মহান আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ নিয়ামত পিতামাতার উপর। তাছাড়া সন্তান জীবনের শোভন ও সৌন্দর্য। সুসন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আর তাদেরকে সঠিকভাবে লালন-পালন করে উপযুক্ত করা পিতামাতার উপর অর্পিত এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যা পালন করা অবশ্যই কর্তব্য।

আমাদের প্রিয় নবীজী হযরত মুহাম্মদ (সা.)ও ছিলেন তার সন্তান-সন্তুতি ও পরিবারের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল। তিনি তার সন্তানদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর তুলনায় পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক স্নেহ-মমতা পোষণকারী আর কাউকে দেখিনি।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ : ৩৭৬)

সন্তান জন্মের সংবাদে রাসূল (সা.) আনন্দিত হতেন। হজরত আবু রাফে (রা.) যখন রাসূল (সা.) কে তার পুত্র ইবরাহিমের জন্মের সংবাদ দেন, তখন তিনি খুশি হয়ে তাকে একজন দাস বা সেবক দান করেন।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর তুলনায় পরিবার-পরিজনের প্রতি অধিক স্নেহ-মমতা পোষণকারী আর কাউকে দেখিনি। তার এক পুত্র (ইবরাহিম) মদিনার উপকণ্ঠে দুধ পান করতো। তার দুধমা ছিলো কায়না। আমরা তার কাছে যেতাম। রাসূল (সা.) তাকে চুমু খেতেন এবং তার ঘ্রাণ নিতেন।’ (আল আদাবুল মুফরাদ : ৩৭৬)

প্রিয় নবীজী রাসূল (সা.) নিজে যেমন কন্যা সন্তানকে অবহেলা করতেন না, তেমনি কেউ পুত্র সন্তানের তুলনায় কন্যা সন্তানকে অবহেলা করলে রাসূল (সা.) তাকে সতর্ক করতেন। 

হজরত আনাসা (রা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বসাছিলো। এ সময় তার পুত্র সন্তান তার কাছে এলো। সে তাকে চুমু দিলো এবং কোলে তুলে নিলো। এরপর তার কন্যা সন্তান এলো এবং সে তাকে সামনে বসিয়ে দিলো। এ দৃশ্য দেখে তিনি বললেন, এদের উভয়ের সঙ্গে একই রকম আচরণ করলে না কেনো?’ (মুসনাদে বাজ্জার : ৬৩৬১)

মহানবী (সা.) সন্তান প্রতিপালনের বা লালন-পালনের ক্ষেত্রে এমন কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছেন, যা সন্তানের নৈতিক উৎকর্ষ, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং আত্মিক বিকাশে অপরিসীম ভূমিকা পালন করে। আজকে আমরা আলোচ্য আর্টিকেলে সন্তান লালন-পালনে নবীজী (সা.)-এর যুগ সেরা কিছু নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করবো-

  • বিশুদ্ধ আকিদার শিক্ষায় নবীজীর নির্দেশনা: সন্তান প্রতিপালনে মহানবী (সা.)-এর প্রথম নির্দেশনা হলো শৈশব থেকে সন্তানের হৃদয়ে বিশুদ্ধ আকিদার ভিত্তি স্থাপন করা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কিশোর বয়সে মহানবী (সা.) তাকে তাওহিদ ও তাকদিরের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

তিনি বলেছেন: “হে বালক, আমি তোমাকে কিছু বাক্য শেখাব: মহান আল্লাহর বিধানের হিফাজত করবে, তিনি তোমাকে হিফাজত করবেন। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্য রাখবে, তাঁকে তোমার সামনে পাবে।” (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)

শৈশব থেকে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস সন্তানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে এবং হতাশা থেকে মুক্ত রাখে।

  • নামাজের নির্দেশ: হযরত মুহাম্মদ (সা.) শৈশব থেকে সন্তানকে ইবাদতে অভ্যস্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন, বিশেষ করে নামাজের ব্যাপারে। নবীজী বলেছেন: “তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামাজের জন্য (প্রয়োজনে) প্রহার করো।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫)

নামাজের প্রতি যত্নশীলতা সন্তানের জীবনে শৃঙ্খলা, আত্মিক প্রশান্তি ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে।

  • উত্তম চরিত্রের শিক্ষার ব্যাপারে নির্দেশনা: মহানবী (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয় আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দান করতে প্রেরিত হয়েছি।” (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ৮৯৫২)

পিতা-মাতার দায়িত্ব সন্তানের মধ্যে আমানতদারি, সততা, বিনয় ও সৎকর্মের মতো গুণাবলী প্রতিষ্ঠা করা। এটি নিজের আচরণ বা উপদেশের মাধ্যমে সম্ভব।

  • দয়া ও কোমলতার নির্দেশনা: সন্তানের প্রতি দয়া ও কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন মহানবী (সা.)। তিনি হযরত হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে চুমু দিতেন এবং বলেছেন: “যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭)

দয়া ও কোমলতা পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ও নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে তোলে।

  • কন্যাসন্তানের প্রতি গুরুত্ব প্রদান: ইসলাম কন্যাসন্তানকে সম্মানের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি দুটি কন্যাসন্তানকে বয়ঃপ্রাপ্তি পর্যন্ত লালন-পালন করে, কিয়ামতের দিন তিনি ও আমি এমন অবস্থায় আসব।” এই বলে তিনি তাঁর আঙ্গুল একত্র করলেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৩১)

কন্যাসন্তানের উত্তম প্রতিপালন বা লালন-পালন হচ্ছে জান্নাত লাভের মাধ্যম।

  • শিক্ষাগ্রহণে উৎসাহ: শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির জন্য মহানবী (সা.) উৎসাহ প্রদান করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন: “হে আল্লাহ, তাকে গভীর প্রজ্ঞা ও কোরআনের গূঢ় রহস্য সম্পর্কে জ্ঞান দান করুন।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬৬)

উৎসাহ শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও সফল করে তোলে।

  • কোরআনের প্রতি ভালোবাসার নির্দেশ: নবীজী (সা.) সন্তানের হৃদয়ে কোরআনের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কোরআন শিখে এবং অন্যকে শেখায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)

কোরআনের শিক্ষা সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং নৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করে থাকে।

  • পাপ থেকে সতর্কতার নির্দেশ: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রজ্ঞা ও কোমলতার সঙ্গে সন্তানদের পাপাচার থেকে সতর্ক করতেন। এক যুবক অনৈতিক কাজের অনুমতি চাইলে তিনি প্রশ্ন করলেন: “তুমি কি নিজের মায়ের জন্য তা পছন্দ কর?” যুবক বললেন, “না।” তিনি বললেন, “লোকেরাও তাদের মায়ের জন্য তা পছন্দ করে না।” (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ২২২১১)

এটি সন্তানকে যুক্তি ও কোমলতার মাধ্যমে অনৈতিক কাজ থেকে বিরত রাখার উত্তম দৃষ্টান্ত।

  • কল্যাণের জন্য দোয়ার নির্দেশ: সন্তানের জন্য কল্যাণকামনা করে দোয়া করা এবং তাদের ওপর বদদোয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন নবীজী (সা.)। তিনি বলেছেন: “তোমরা নিজেদের, সন্তান-সন্ততি, ভৃত্য বা সম্পদের ওপর বদদোয়া করো না।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৩২)।

পিতামাতার দোয়া মহান আল্লাহ কবুল করেন, যা সন্তানের জন্য নিরাপত্তা ও রহমত বয়ে আনে।

সন্তান লালন-পালনে ইসলামের কিছু নির্দেশনা জেনে নিন

পবিত্র কোরআনে সন্তানকে আল্লাহ তাআলা জীবনের সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘সম্পদ ও সন্তান পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য। ’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৪৬)

সন্তান যেন জীবনের সম্পদ ও শোভা হয়ে ওঠে এ জন্য ইসলাম মা-বাবাকেও কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্দেশনা নিম্নে তুলে ধরা হলো—

  • একজন আদর্শ মা নির্বাচন: সুসন্তান লাভের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো সন্তানের জন্য আদর্শ মা নির্বাচন করা। অর্থাৎ এমন নারীকে বিয়ে করা, যে সন্তানের আদর্শ মা হতে পারবে। হাদিসে বিয়ের আগে মেয়ের চারটি গুণাগুণ দেখতে বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নারীদের চারটি গুণ দেখে বিয়ে করো—তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য ও তার দ্বিনদারী। তবে তুমি দ্বিনদারীকে প্রাধান্য দেবে। নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৯০)

হাদিসে দ্বিনদারীকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। দ্বিনদারী অর্থ শুধু ইবাদত পালন নয়। দ্বিনদারীর অর্থ হলো, আল্লাহ বর্ণিত সব বিধান মান্য করে চলা। স্ত্রী হিসেবে, ঘরের বউ হিসেবে, সন্তানের মা হিসেবে তার করণীয়গুলো পালন করা।

  • সুসন্তান লাভের দোয়া করা: সন্তান আল্লাহর দান। আল্লাহ যাকে খুশি তাকে সন্তান দান করেন এবং যাকে খুশি দান করেন না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দেন। আবার কাউকে কন্যা ও পুত্রসন্তান উভয়টি দেন। যাকে ইচ্ছা তিনি বন্ধ্যা করেন। নিশ্চয়ই তিনি সব কিছু জানেন এবং সব কিছুতে সক্ষম। ’ (সূরা : আশ-শুরা, আয়াত : ৫০)

আর সুসন্তান আল্লাহর অনেক বড় অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহ লাভের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা আবশ্যক। আল্লাহ কোরআনে মানুষকে সুসন্তান লাভের দোয়া শিখিয়েছেন। এই দোয়াকারী মা-বাবার প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ‘এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রভু, আমাদের দান করুন চোখ শীতলকারী স্ত্রী ও সন্তান। আমাদের আপনি খোদাভীরুদের নেতা নির্বাচন করুন। ’ (সূরা : ফোরকান, আয়াত : ৭৪)

  • ছেলে ও মেয়েতে বৈষম্য না করা: সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে- তার জন্মে আনন্দ প্রকাশ করা মা-বাবার জন্য ঈমানের পরিচায়ক। আল্লাহ তায়ালা ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্মকে কোরআনে সুসংবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইয়াহইয়া (আ.) সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে জাকারিয়া, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে পুত্রসন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি। তার নাম ইয়াহইয়া। এই নাম আগে কারো রাখা হয়নি। ’ (সূরা : মারিয়াম, আয়াত : ৭)
  • সুন্দর নাম রাখা: সুন্দর ও অর্থবহ নাম সন্তানের প্রথম অধিকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তান জন্মের সাত দিনের ভেতর তার নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সন্তানের নাম সুন্দর ও অর্থবহ হওয়া আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলাম গ্রহণের পর অনেক সাহাবির নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। কেননা তাঁদের নাম ইসলামী ভাবাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল অথবা তাঁদের নাম অর্থপূর্ণ ছিল না। জয়নব (রা.)-এর নাম ‘বাররাহ’ পরিবর্তন করে জয়নব রাখেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৯২)

সন্তানের নাম রাখার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন তোমাদের নামে এবং তোমাদের পিতাদের নামে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো। ’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৮)

উত্তম প্রতিপালন: শিক্ষা-দীক্ষা, পারিবারিক প্রতিপালন ও পারিপার্শ্বিকতা সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই সন্তান প্রতিপালনে মা-বাবা ও অভিভাবকদের অনেক বেশি যত্নশীল হতে হবে। সন্তানের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই ভবিষ্যতে সে আদর্শ মানুষ হয়ে উঠবে। পরিবার, দেশ ও জাতির সম্পদে পরিণত হবে।

সন্তান লালন-পালনে কিছু বর্জনীয় কাজ সম্পর্কে জানুন

সন্তান লালন-পালনে পিতা-মাতাকে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। অনেক সময় সতর্কতা সত্ত্বেও সন্তান লালন-পালনে পিতা-মাতা অনেক ভুল-ভ্রান্তি করে থাকেন। এ সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি বর্জন করলে আদর্শ সন্তান গড়ে তোলা অসম্ভব কিছুই নয়। যেমন-

  • পিতা-মাতা ও সন্তানদের মাঝে দূরত্ব: আমাদের বেশিরভাগ পিতা-মাতাই ছেলে-মেয়েদের সাথে যোগাযোগ, আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তা বলার গুরুত্ব বুঝতে চান না। বরং তারা আলাপচারিতাকে মূল্যহীন ভাবেন। ফলে পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরে।

সন্তানের কথার প্রতি যখন গুরুত্ব দেওয়া হয় না তখন সে সহজেই খারাপ সাথীদের সাথে মিশে যায়। সে এমন কাউকে চায়, যে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে, তাকে ও তার কথাকে মূল্যায়ন করবে এবং তার মনঃকষ্ট দূর করবে। মূলত এমন কাউকে তালাশ করতে গিয়ে সে খারাপ সাথীদের পাল্লায় পড়ে যায়।

অনেক পিতা আছেন যারা ছেলে-মেয়েদের উপর নিজেদের মত জোর করে চাপিয়ে দেন। এটা সঠিক নয়। আমাদের বুঝা দরকার, প্রত্যেক প্রজন্মের পৃথক পৃথক সংস্কৃতি, চিন্তা-ভাবনা ও চাহিদা রয়েছে।

ইমাম আলী (রহঃ) কতই না সুন্দর বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের তোমাদের যুগের শিষ্টাচার শেখানোর উপর সীমাবদ্ধ থেকো না। কেননা তারা তোমাদের যুগ থেকে পৃথক যুগের জন্য সৃষ্ট।

  • ব্যক্তি স্বাতন্ত্রকে গুরুত্ব না দেওয়া: আল্লাহ তায়ালা নানা ঝোঁক, খেয়াল ও মেজাজের মানুষ সৃষ্টি করেছেন। ইসলাম তাই বিভিন্ন ব্যক্তির মাঝে পার্থক্য স্বীকার করে। এ কথা যেমন পুরো মুসলিম সমাজের জন্য প্রযোজ্য, তেমনি পুরো পরিবারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

সুতরাং পিতা-মাতাকে জানতে হবে যে, তাদের সন্তানরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাদের কেউ হয়তো দ্রুত ডাকে সাড়া দেয়, আবার কেউ ধীরগতির, কেউ আবার চঞ্চলমতির। সুতরাং সকল সন্তান একভাবে কাজ করবে না এবং সবার থেকে এক পদ্ধতিতে কাজ চাইলে পাওয়া যাবে না।

  • অন্যের সাথে তুলনা করা: বস্তুত শিশুর মন-মানসিকতা বড়দের মতই। আপনি যখন তাকে তার থেকে অগ্রসর অথবা মেধাবী অথবা শান্ত কোন ভাই কিংবা বোনের সাথে তুলনা করেন তখন সে ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত হয়। এ জাতীয় তুলনা শিশুর মধ্যে মানসিক অশান্তি ও গোলযোগ বয়ে আনে এবং তার ব্যক্তিত্ব দুর্বল করে দেয়। সে ভাবে, তার ভাই যা করতে পারছে তা সে করতে পারছে না, অথবা জীবনে আদৌ করতে পারবে না।

অথচ দেখা যাবে, সেও এমন কোন কাজ নিশ্চয়ই করতে পারে যা তার ঐ ভাই করতে পারে না। সে তো আদতে তার ভাইয়ের অনুলিপি বা কার্বন কপি না। সুতরাং এই বিষয়টি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

  • সন্তানদের মধ্যে সমতা ও ইনছাফ বজায় না রাখা: সন্তানদের মধ্যে সমতা ও ইনছাফ বজায় না রাখার ফলে তাদের মধ্যে হিংসা, শত্রুতা, অবাধ্যতা ও পারস্পরিক ঘৃণা জন্ম নেয়। সেজন্য পিতা-মাতাকে সন্তানদের মধ্যে পারস্পরিক আচরণ, কথা-বার্তা এবং সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সমতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • সন্তানকে দায়িত্ব না দেয়া: সন্তানকে কোন কাজের দায়িত্ব না দিয়ে বেকার বসিয়ে রেখে লালন-পালন করা সন্তান প্রতিপালনের একটি মারাত্মক ভুল। দেখা যায়, পিতাই পরিবারের সকল কিছুর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। তিনি সকল প্রকার কাজ করে যান। সন্তান বয়স্ক ও নির্ভরযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে কোন দায়িত্ব দিতে চান না। তিনি বুঝতে চান না, এর ফলে সন্তানের ব্যক্তিত্ব দুর্বল হয়ে পড়ছে।

নবী করীম (সা.) সন্তানকে পৌরুষদীপ্ত ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছেন।

  • অতিরিক্ত আদর-স্নেহ: সন্তানকে অতিরিক্ত আদর-স্নেহ দেওয়া, চোখের আড়াল হ’তে না দেওয়া। বিশেষত মায়ের পক্ষ থেকে বেশী আদর-আহ্লাদ সন্তানের মানসিকতা ও আচরণের উপর মারাত্মক খারাপ প্রভাব ফেলে। এর ফলে সন্তানের মধ্যে লাজুকতা, অন্তর্মুখিতা, অধিক ভীতি, আত্মবিশ্বাসে দুর্বলতা, সাথী-সঙ্গীদের সংস্রব থেকে দূরে থাকার প্রবণতা তৈরী হয়। সে হয়ে পড়ে আলালের ঘরের দুলাল।

অতি আদরে নষ্ট সন্তানের উপর অনেক সময় আমিত্ব বা আত্মঅহমিকা ভর করে। সে নিজেকে তার ভাই-বোনদের থেকে আলাদা মনে করে। তাদের উপর ক্ষমতা খাটাতে পসন্দ করে এবং তাদের সাথে কঠোর আচরণ করে।

  • মাত্রাতিরিক্ত নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ও নির্দয়তা : দেখা যায়, অতিরিক্ত স্নেহ-আদর যেমন শিশুর উপর খারাপ ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তেমনিভাবে মাত্রাতিরিক্ত নিষ্ঠুরতাও তার উপর একই রকম কুপ্রভাব ও খারাপ পরিণতি ডেকে আনে।

সন্তানদের প্রতি নির্দয় নিষ্ঠুর আচরণের মাত্রা অনেক অভিভাবকের ক্ষেত্রে এতটাই সীমা ছাড়িয়ে যায় যে, হিংস্র প্রাণীদেরও তাদের তুলনায় বেশী দয়ালু হ’তে দেখা যায়।

পিতা-মাাতাদের জানতে হবে, কঠোরতা ও নির্মমতা ওষুধের মতো, যা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। সংশোধনের নমনীয় নানা উপায়-পদ্ধতি যখন কোন কাজ দেবে না তখন শেষ চিকিৎসা হিসাবে অভিভাবক কঠোরতা আরোপ করতে পারেন।

আরো পড়ুনঃ

পোস্টের শেষ-কথাঃ সন্তান লালন-পালনে নবীজী (সা.)-এর যুগ সেরা কিছু নির্দেশনা

পরিশেষে, উপরোক্ত আর্টিকেলটির আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাই যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)- এর এই নির্দেশনাগুলো সন্তান প্রতিপালনে বা লালন-পালনে একটি পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা। এগুলো সন্তানের হৃদয়ে বিশুদ্ধ আকিদা, ইবাদতের অভ্যাস, নৈতিক শিক্ষা, সমতা ও কোমলতা প্রতিষ্ঠা করে। ফলে সন্তান দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ ও সাফল্য লাভ করে।

তাছাড়া, সন্তান দুনিয়াবী জীবনে মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সন্তানকে সুসন্তান হিসাবে গড়ে তোলা এবং দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য মূল্যবান সম্পদে পরিণত করা প্রতিটি পিতা-মাতার সর্বোচ্চ দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে তারা দুনিয়া ও আখেরাতে অশেষ মর্যাদার অধিকারী হবেন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

গ্রো কেয়ার আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url