ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতকারী পাঁচ নারী সাহাবি ছিলেন যারা...

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম,

প্রিয় পাঠক- আসসালামু আলাইকুম, আজকের আর্টিকেলটিতে আমরা এমন পাঁচজন নারী হিজরতকারী সাহাবি নিয়ে আলোচনা করবো; যারা কিনা তৎকালীন সময়ে মক্কার কাফেরদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে আবিসিনিয়ায় (হাবশা) হিজরত করেছিলেন নবী করিম (সা.)- এর পরামর্শেক্রমে।

ইসলামের-ইতিহাসে-প্রথম-হিজরতকারী-পাঁচ-নারী-সাহাবি-ছিলেন-যারা

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরত ছিল মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া)। সেখানে ১১ জন পুরুষের সাথে ৫ জন নারী সাহাবিও ছিলেন। পরবর্তীতে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় আরও অনেক নারী সাহাবি পরিবারসহ হিজরত করেন।

পেজ সূচিপত্রঃ ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতকারী পাঁচ নারী সাহাবি ছিলেন যারা...

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতকারী পাঁচ নারী সাহাবি ছিলেন যারা...

মহান হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই হিজরতের পেছনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানও ছিল অসামান্য। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই ইসলামের দাওয়াত নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছেছিল এবং মুসলিম সমাজের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে সংগ্রাম করেছে, আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা অনেক উচ্চ।’ (সূরা : তাওবা, আয়াত : ২০)

নব্যুয়াতলাভের পঞ্চম বছর, নবীজি (সা.) দেখলেন শুধুমাত্র ইসলামগ্রহণের ‘অপরাধে’ নিজ গোত্রের আপন লোকেরাই সাহাবিগণের ওপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করেছে। দিন যত যায়, জুলুম-নিপীড়ন আর অবমাননা বাড়তে থাকে। যারা সমাজে খুব সম্মানের সাথে চলাফেরা করতেন, তাদেরই এখন আড়ালে বা লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে।

সাহাবিগণের এই ‘পরাধীনতা’ নবীজির (সা.) মনে খুব কষ্ট দিল। তিনি তাদের বললেন, ‘তোমরা আল্লাহর জমিনের কোথাও হিজরত করে চলে যাও, আল্লাহ শীঘ্রই তোমাদের একত্রিত করবেন। সাহাবিগণ আরজ করলেন, কোথায় যাব? তিনি হাবশার দিকে ইঙ্গিত করেন।’  (সীরাতুল মুস্তফা, ইদরীস কান্ধলবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১১-২১২, ইফাবা)

আরেক বর্ণনায় আছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা হাবশায় চলে যাও, এটাই তোমাদের জন্য ভালো। কারণ সেখানে একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ আছেন, যার রাজত্বে কেউ জুলুমে শিকার হয় না। সেই দেশটা সত্য ও ন্যায়ের দেশ। আল্লাহ যতদিন পর্যন্ত তোমাদের জন্য এই জুলুম থেকে বাঁচার পরিবেশ না করে দেন, ততদিন পর্যন্ত তোমরা সেখানে থাকতে পারো। (সীরাতুন নবী, ইবনে হিশাম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৪, ইফাবা)

এই নির্দেশ পেয়ে ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে, হিজরিপূর্ব ৭ সালের রজব মাসে সাহাবিগণ মক্কা ছেড়ে সমুদ্রপথে আফ্রিকার দিকে রওনা দেন, যা ইতিহাসের কিতাবে ‘হাবশায় প্রথম হিজরত’ নামে প্রসিদ্ধ।

তারা খ্রিষ্টান রাজা নাজ্জাশি শাসিত আকসুম রাজ্যে (বর্তমান ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া) গিয়ে নোঙর ফেলেন, এবং সেখানে বেশ নিরাপত্তার সঙ্গে তিন থেকে চারমাস বসবাস করেন। এরপর এমন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মক্কার সবাই ইসলামগ্রহণ করে ফেলেছে, তাই তারা ফিরে আসেন।

প্রথম হিজরতের দলে ছিলেন ১১জন পুরুষ এবং ৫জন নারী। ইতিহাসে এই পাঁচজন নারী বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তাঁরা ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের নারী সংগ্রামী, যাঁদের ঈমান ও ত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শ হয়ে আছে।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতকারী নারী সাহাবিরা হলেন-

নবী কন্যা রুকাইয়াহ (রা.)

নবী কন্যা রুকাইয়াহ (রা.) তাঁর জন্ম ৬০১ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি ছিলেন নবীজির (সা.) দ্বিতীয় মেয়ে। সর্বপ্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী নারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মহানবী (সা.)-এর কন্যা রুকাইয়াহ (রা.)। তিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.)-এর কন্যা। শৈশবেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের কারণে বহু কষ্ট সহ্য করেন।

আবু লাহাবের ছেলে উতবাহর সাথে তাঁর বিয়ের চুক্তি (আকদ) হয়েছিল। কিন্তু নবীজি (সা.) নব্যুয়াতপ্রাপ্তির ঘোষণা দিলে আবু লাহাব সেই আকদ ভেঙে দেয়। পরবর্তীতে তাঁর বিবাহ হয় মহান সাহাবি ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর সঙ্গে। এই সৌভাগ্যবান দম্পতি প্রথমে আবিসিনিয়া এবং পরে মদিনায় হিজরত করেন।এই সময় তার বয়স ছিল ১৫।

তাঁরা যখন হিজরত করার উদ্দেশ্যে রওনা দেন, নবীজি (সা.) তাদের কোনো খোঁজখবর পাচ্ছিলেন না। তিনি প্রতিদিন তাদের খবর নিতে বের হতেন। একদিন জনৈক মহিলা জানান তাঁরা হাবশায় পৌঁছেছেন, নবীজি (সা.) এ খবর শুনে মন্তব্য করেন, ‘হজরত লুতের (আ) পর ওসমানই (রা.) প্রথম ব্যক্তি যিনি সপরিবারে হিজরত করেছেন। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদিস: ১৪৯৯৮)

হযরত নবী কন্যা রুকাইয়া (রা.) ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

আরো পড়ুনঃ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ৩০ জন মহিলা সাহাবীদের নাম

উম্মে সালামা হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া (রা.)

উম্মে সালামা হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া (রা.) তাঁর জন্ম ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি ছিলেন নবীজির (সা.) ফুফাতো ভাই ও দুধভাই আবু সালামা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল আসাদের (রা.) স্ত্রী। স্বামীর সাথে তিনি হাবশায় হিজরত করেন, তখন তার বয়স ছিল ২১।

সে সময় তিনি সন্তানসম্ভাবা ছিলেন, হাবশায় তাদের প্রথম পুত্র সালামার জন্ম হয়। তিনি ছিলেন খুবই সাহসী ও জ্ঞান অনুরাগী নারী। তার অনেক প্রশ্নের ওপর কোরআনের আয়াত নাজিল হয়েছিল।

মুমিনদের মাতা উম্মে সালামা (রা.)- এর জীবন হিজরতের কষ্ট ও ধৈর্যের এক অসাধারণ অধ্যায়। তিনি তাঁর স্বামী আবু সালামা (রা.)-এর সঙ্গে হিজরতের প্রস্তুতি নিলে তাঁর গোত্র তাঁকে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অন্যদিকে তাঁর সন্তানের অভিভাবকরাও শিশুকে তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়।

ফলে একদিকে স্বামী, অন্যদিকে সন্তান - দুজনের কাছ থেকেই তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, প্রায় এক বছর ধরে তিনি প্রতিদিন উপত্যকায় বসে কান্নাকাটি করতেন। অবশেষে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্য সহজ ব্যবস্থা করে দেন এবং তিনি সন্তানকে নিয়ে একা মদিনার পথে যাত্রা করেন।

জীবনের শেষদিকে তিনি একদম সবার আড়ালে চলে যান, এমনকি তার মৃত্যুর তারিখ সঠিকভাবে জানা যায় না।

আরো পড়ুনঃ ইসলামে নারীর মর্যাদা কেমন হওয়া উচিত?

সাহলা বিনতে সুহাইল (রা.)

সাহলা বিনত সুহাইল (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের নবী মুহাম্মদের (সা.) একজন মহিয়সী সাহাবী। তিনি ছিলেন আবু হুজাইফা ইবন উতবার স্ত্রী। হাবশায় হিজরতের সময় তিনিও সন্তানসম্ভাবা ছিলেন। সেখানে তাদের পুত্র মুহাম্মদ বিন আবু হুজায়ফার (রা.) জন্ম হয়। তাঁদের ‘সালিম মাওলা আবি হুজাইফা’ নামে এক পালকপুত্রও ছিল।

সাহলা বিনতে সুহাইল (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে যে কয়েকজন সাহাবি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, সাহলা (রা.) ও তাঁর স্বামী আবু হুজাইফা (রা.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় মক্কায় ফিরে আসেন এবং মদিনায় হিজরত করেন।

সাহলা বিনতে সুহাইল (রা.) অত্যন্ত সাহসিকতা ও ঈমানের সাথে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি তাঁর স্বামী এবং পালকপুত্র উভয়েরই শাহাদাত বরণ নিজ চোখে ধৈর্য ও সাহসের সাথে সহ্য করেছিলেন।

আরো পড়ুনঃ নারীদের চাকরি করা কি জায়েজ- ইসলামে এর বিধান কি?

লায়লা বিনতে আবু হাতমা (রা.)

প্রথম আবিসিনিয়া হিজরতের আরেক সাহসী নারী ছিলেন লায়লা বিনতে আবু হাতমা (রা.)। তিনি তাঁর স্বামী আমির ইবনে রাবিয়া (রা.)- এর সঙ্গে হিজরত করেন। মক্কা ত্যাগের আগে তাঁর সঙ্গে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটে। তখনও ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেননি। লায়লা (রা.) যখন হিজরতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ওমর তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কি সত্যিই চলে যাচ্ছ?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনারা আমাদের ওপর এত অত্যাচার করেছেন যে আমরা আল্লাহর জমিনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি’।

লায়লা (রা.) পরে বলেন, সেদিন তিনি ওমরের চোখে এক ধরনের কোমলতা ও অনুশোচনা দেখেছিলেন। অল্প কিছুদিন পরই উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের অন্যতম মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

উম্মে কুলসুম বিনতে সুহায়ল (রা.)

উম্মে কুলসুম বিনতে সুহায়ল (রা.)- তিনি ছিলেন নবীজির (সা.) ফুফাতো ভাই হযরত আবু সাবরাহ ইবনে আবু রাহমের (রা.) স্ত্রী। তার স্বামী হাবশায় দুই-দুইবার হিজরত করেছিলেন।

কিন্তু তিনি প্রথমবার স্বামীর সাথে ছিলেন কিনা এই বিষয়ে মতবিরোধ আছে। হাফিজ ইবনে সাইয়িদুন নাস ‘উয়ুনুল আসার’-এ প্রথম হিজরতকারীদের তালিকায় তার নাম উল্লেখ করেছেন। তবে ইবনে ইসহাক তাকে দ্বিতীয় হিজরতকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। (কিতাবুল ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবাহ, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৬২, মাকতাবায়ে শামেলা)

পোস্টের শেষ-কথাঃ ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরতকারী পাঁচ নারী সাহাবি ছিলেন যারা...

পরিশেষে বলতে পারি যে, আজ যখন মুসলিম সমাজ নারীদের নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন রুকাইয়াহ (রা.), উম্মে সালামা (রা.), সাহলা বিনতে সুহাইল (রা.) এবং লায়লা বিনতে আবি হাতমা (রা.)-এর জীবন আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তাঁদের ত্যাগ ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও উচিত ঈমানের পথে দৃঢ় থাকা, ইসলামের জন্য কাজ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই মহান সাহাবিয়াদের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

গ্রো কেয়ার আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url