পুরাতন সোনা বিক্রিতে দাম কমে কেন এবং বিক্রি করার নিয়ম

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম,

প্রিয় পাঠক- আসসালামু আলাইকুম, নারী আর সোনার গহনা একে অপরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত আদিকাল থেকেই। এমন কোন নারী নেই যে, তার কাছে সোনার গহনা নেই। কিন্তু অনেকেই বিপদে পড়ে নিজেদের কেনা সোনার গহনা বিক্রি করতে যান। দেখা যায়, বাজারদর চড়া থাকা সত্ত্বেও কেনা দামের চেয়ে বেশ কম দামে সোনা বিক্রি করতে হচ্ছে।

পুরাতন-সোনা-বিক্রিতে-দাম-কমে-কেন-এবং-বিক্রি-করার-নিয়ম

তাই আজকে আমরা এই পোস্টটিতে পুরাতন সোনা বিক্রি করলে দাম কমে কেন এবং কিভাবে বিক্রি করলে লোকসান কম হবে তা নিয়ে আলোচনা করবো।

পেজ সূচিপত্রঃ পুরাতন সোনা বিক্রিতে দাম কমে কেন এবং বিক্রি করার নিয়ম

পুরাতন সোনা বিক্রিতে দাম কমে কেন এবং বিক্রি করার নিয়ম

সাধারণভাবে আমরা দেখি যে, কেনার সময় গ্রাহককে সোনার মূল দামের পাশাপাশি গয়নার মজুরি (মেকিং চার্জ) এবং সরকারি ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু বিক্রির সময় জুয়েলার্স মালিকরা কেবল পুরাতন সোনার বিশুদ্ধ ওজন বিবেচনা করেন। পুরাতন সোনার গহনার নকশা বা মজুরির টাকা তারা ফেরত দেন না, কারণ ওই গহনাটি গলিয়ে আবার নতুন গয়না তৈরি করা হয়। ফলে শুরুতেই একটি বড় অংকের টাকা বাদ পড়ে যায়।
পুরাতন-সোনা-বিক্রিতে-দাম-কমে-কেন

তাছাড়া, সব সোনার মান এক নয়। ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট বা ১৮ ক্যারেট - ক্যারেট যত কম হয়, তাতে সোনার সঙ্গে তামা বা অন্য ধাতুর মিশ্রণ তত বেশি থাকে। পুরাতন সোনা বিক্রির সময় ক্যারেট অনুযায়ী সোনার প্রকৃত ওজন মেপে দাম নির্ধারণ করা হয়, যা কেনা দামের চেয়ে কম হওয়ার অন্যতম কারণ।

আবার দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে গহনায় ঘষা লেগে সূক্ষ্মভাবে ওজন কমে যেতে পারে। এছাড়া গহনায় পাথর, পুঁতি বা মিনাকারি থাকলে বিক্রির সময় সেগুলোর ওজন সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে কেবল নিরেট সোনার হিসাব করা হয়।

পুরাতন সোনা বিক্রিতে দাম কমে কেন এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা পাশাপাশি পুরাতন সোনার গহনা বিক্রি করার নিয়ম নিয়েও আলোচনা করবো-

পুরাতন সোনা বিক্রির সময় সাধারণত ৩টি প্রধান কারণে দাম কমে যায়

  • খাদ এবং মজুরি খরচ বাদ দেওয়া: গহনা তৈরির সময় সোনার সাথে তামা বা রুপা (খাদ) মেশানো হয়। বিক্রির সময় ক্রেতা শুধু আসল সোনার দাম দেয়, খাদের অংশ এবং মজুরি খরচ পুরোপুরি বাদ যায়।
  • ওজন কমে যাওয়া ও পরিশোধন খরচ: পুরনো সোনা গলিয়ে নতুন গহনা বানানোর উপযোগী করতে গিয়ে কিছুটা সোনা পুড়ে নষ্ট হয়। এই পরিশোধন খরচ বিক্রেতার ওপর বর্তায়।
  • দোকানির লাভ: জুয়েলার্স পুরনো সোনা কেনার পর তা সাথে সাথে বিক্রি করতে পারে না। সেগুলো গলানো, পুনরায় পরীক্ষা করা এবং লভ্যাংশের জন্য একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (সাধারণত ১০% থেকে ১৮%) দাম কম রাখে।

মোটকথা হলো, আপনি কেনার সময় - আসল সোনা + খাদ + মজুরি + ভ্যাট এর দাম দেন। কিন্তু পুরাতন সোনা বিক্রি করার সময় শুধু আসল সোনার দাম পান।

সোনা বিক্রির ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতা যাচাই সম্পর্কে কিছু আলোচনা

সোনা বিক্রি করার ক্ষেত্রে কত দাম পাওয়া যাবে সেটা নির্ভর করে এর বিশুদ্ধতার উপর। এক্ষেত্রে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সোনা কেনাবেচার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতা যাচাই ও দাম নির্ধারণ ক্যারেট অনুযায়ী হয়।

বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সোনার চারটি মান রয়েছে। যথাক্রমে ১৮, ২১, ২২ ও ২৪ ক্যারেট। যত বেশি ক্যারেট সোনা তত বেশি বিশুদ্ধ। এর মধ্যে ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনার দাম নির্ধারণ করে থাকে বাজুস। সেইসাথে পুরনো সোনা বিক্রির দামও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

সোনা বিক্রি করতে গেলে সবার আগে পরীক্ষা করে দেখা হয় এতে কী পরিমাণ খাঁটি সোনা আছে আর কী পরিমাণ খাদ। এক্ষেত্রে যিনি বিক্রি করবেন, তার উচিত হবে নির্ভরযোগ্য গহনার দোকানে সোনার বিশুদ্ধতা যাচাই করে প্রকৃত দাম জেনে লেনদেন করা।

আমাদের দেশে এক সময় কষ্টিপাথর দিয়ে সোনার বিশুদ্ধতা পরিমাপ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে সোনা নীতিমালা অনুযায়ী, পরীক্ষাগারে একাধিক যন্ত্রের সাহায্যে পাঁচ ধাপে সোনার বিশুদ্ধতা যাচাই করা হয়। আধুনিক নিয়মে বিক্রি করতে আনা স্বর্ণটি এক্স-রে করে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া হয়। তারপর এর বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা নিয়ে সেটি গলিয়ে বা ফায়ার টেস্ট করে পরীক্ষা করা হয়। তারপর মাইক্রো ব্যালেন্স মেশিনে ওজন করে নির্ণয় করা হয় কতটুকু বিশুদ্ধ স্বর্ণ আছে।

এছাড়া হলমার্ক পদ্ধতিও গহনার বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের সরকার নির্দেশিত আধুনিক মাধ্যম। বাজুসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়াল জানান, হলমার্ক হলো এই গহনায় কতটা বিশুদ্ধ স্বর্ণ আছে তা খোদাই করে লিখে দেওয়া।

পুরাতন সোনা বিক্রি করার আগে যা জানা জরুরি

বর্তমান সোনার বাজার দাম যেভাবে আপনি বুঝবেন:
  • অনেক মানুষ সরাসরি দোকানে গিয়ে সোনার দাম জিজ্ঞেস করেন। দোকানদার যদি কম দাম বলে, ক্রেতা সেটাই বিশ্বাস করে নেন।
  • ক্রেতার কাছে বর্তমান বাজার দর সম্পর্কে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি বা সঠিক তথ্য থাকে না।
  • বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (BAJUS) এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা নির্ভরযোগ্য নিউজ পোর্টাল থেকে আজকের সোনার দাম বাংলাদেশ চেক করে নিন। বাজুস প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে ২২, ২১, ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার রেট নির্ধারণ করে দেয়।

পুরাতন সোনা বিক্রি করার সঠিক নিয়ম জানুন

পুরাতন সোনা বিক্রি করলে সব দোকানে সমান দাম পাওয়া যায় না। এক দোকানে গেলে তারা যে দাম বলে, পাশের দোকানে গেলে তার চেয়ে কয়েক হাজার টাকা কম বলে। কারণ, অন্য দোকান থেকে কেনা গয়না হলে জুয়েলার্সরা সেটি গলাতে গিয়ে খাদের ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই তারা ইচ্ছে করেই বেশি কর্তন করে।

তাই পুরাতন সোনা বিক্রি করার সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো- যেই দোকান থেকে কিনেছেন, ক্যাশ মেমো সহ ঠিক সেখানেই বিক্রি করা। বাজুসের নিয়ম অনুযায়ী, ক্যাশ মেমো থাকলে নগদ বিক্রির ক্ষেত্রে মূল দাম থেকে সাধারণত ১৩% থেকে ১৫% বাদ দেওয়া হয়। তাই পুরাতন সোনা কিভাবে বিক্রি করবেন তার সঠিক নিয়ম দেখে নিন-

  • প্রথমে বর্তমান বাজার দর জানুন:
আপনি বাসা থেকে বের হওয়ার আগে অনলাইনে নিউজ পোর্টাল বা বাজুসের পেজ থেকে ভরিপ্রতি আজকের দামটি নোট করুন। মনে রাখবেন, ১ ভরি সমান ১১.৬৬৪ গ্রাম।

  • সোনার মান ও ক্যাশ মেমো যাচাই করুন:
আপনি আপনার ক্যাশ মেমো বের করে নিশ্চিত হোন পুরাতন সোনাটি কত ক্যারেটের। গয়নায় কোনো পাথর বা মিনা করা থাকলে সেটির আনুমানিক ওজন মেমোতে লেখা আছে কি না তা দেখে নিন। নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) একটি ফটোকপি সাথে রাখুন, এটি আইনি সুরক্ষার জন্য কাজে লাগবে।

  • একাধিক দোকানে দর যাচাই:
একটি দোকানে দাম শুনেই বিক্রি করবেন না। অন্তত ৩-৪টি বড় জুয়েলারি শপে গিয়ে আপনার গহনার ওজন এবং ক্যারেট অনুযায়ী তারা কত দাম দেবে তা যাচাই করুন। এতে বাজারের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবেন।

  • বাজার চড়ার জন্য অপেক্ষা করুন:
সোনার দাম প্রতিদিন ওঠানামা করে। যদি জরুরি প্রয়োজন না হয়, তবে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বৃদ্ধি পায় এবং BAJUS নতুন রেট ঘোষণা করে, সেই সময়ে বিক্রি করুন।

  • পাথর ও মিনা বাদ দিয়ে হিসাব:
আপনার গয়নায় যদি পাথর বা কুন্দন থাকে, তবে বিক্রির আগে পাথরগুলো খুলে নেওয়ার অনুরোধ করুন অথবা পাথরের ওজন আলাদা করে সোনার নিরেট ওজন বুঝে নিন। মনে রাখবেন, পাথর সোনার দামে কেনা হলেও বিক্রির সময় তার কোনো মূল্য পাওয়া যায় না।

  • হলমার্ক যাচাই:
আপনার সোনায় যদি হলমার্ক খোদাই করা থাকে, তবে আপনি আত্মবিশ্বাসের সাথে দামাদামি করতে পারবেন। এটি সোনার বিশুদ্ধতার প্রমাণ, ফলে দোকানদার ক্যারেট নিয়ে কারচুপি করার সুযোগ পাবে না।

  • দরদাম ও হিসাব ক্লিয়ার করুন:
দোকানদারের সাথে বাজুস নির্ধারিত কর্তন নিয়ে ক্লিয়ার কথা বলুন। যদি তারা ১৩% এর বেশি কাটার কথা বলে, তবে ক্যাশ মেমোর রেফারেন্স দিয়ে দরদাম করুন।

পুরাতন বিক্রি করার ক্ষেত্রে প্রতারণা এড়ানোর উপায় জানুন

  • অনেক অসাধু গহনা ব্যবসায়ী টেম্পার করা ডিজিটাল মেশিন ব্যবহার করে ওজন কম দেখায়।
এক্ষেত্রে, সবসময় ডিজিটাল মিটারে নিজের চোখের সামনে ওজন দেখুন। বাতাস বা ফ্যানের কারণে মিটারে তারতম্য হচ্ছে কি না খেয়াল করুন।
  • অনেক সময় দোকানদার বলে যে গয়নায় অনেক ময়লা জমেছে, তাই ওজন বেশি দেখাচ্ছে।
এক্ষেত্রে, আপনি বাসা থেকে গয়না ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিয়ে যাবেন, যাতে ডাস্টের দোহাই দিয়ে দাম কাটতে না পারে।
  • বড় অঙ্কের টাকা ক্যাশ নেওয়ার চেয়ে ব্যাংক ট্রান্সফার বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ। এটি ছিনতাইয়ের হাত থেকে বাঁচাবে এবং লেনদেনের একটি ডিজিটাল প্রমাণ থাকবে।

প্রশ্ন ও উত্তরঃ পুরাতন সোনা বিক্রিতে দাম কমে কেন এবং বিক্রি করার নিয়ম

প্রশ্নঃ পুরাতন সোনার দাম কিভাবে হিসাবের নিয়ম কি?
উত্তরঃ স্বর্ণকাররা পুরাতন সোনার গহনার পুনঃবিক্রয় মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করেন? স্বর্ণকাররা ওজন, বিশুদ্ধতা ও আজকের সোনার দরের গুণফলের সূত্রটি ব্যবহার করেন এবং তারপর তা থেকে তৈরির খরচ ও পরিশোধনের খরচ বাদ দেন।

প্রশ্নঃ পুরাতন সোনা বদল করা যাবে কি?
উত্তরঃ আপনি আপনার পুরোনো সোনার গয়না নতুন কিছুর সাথে বদল করতে পারেন, এবং এটি আপনার অব্যবহৃত গয়না থেকে ভালো মূল্য পাওয়ার একটি বুদ্ধিদীপ্ত উপায়।

প্রশ্নঃ পুরাতন সোনা বিনিময় এর ফরমূলা কি?
উত্তরঃ সোনার মূল্য = ওজন (গ্রাম) × বিশুদ্ধতা × প্রতি গ্রাম সোনার দাম।

এই ফরমূলাটি সোনার মূল্য নির্ধারণের সকল পদ্ধতির ভিত্তি এবং এটি স্বর্ণকার, সোনা ক্রেতা, এমনকি পুরনো সোনা বিক্রয় দর ক্যালকুলেটরের মতো অনলাইন সরঞ্জাম দ্বারাও ব্যবহৃত হয়।

পোস্টের শেষ-কথাঃ পুরাতন সোনা বিক্রিতে দাম কমে কেন  এবং বিক্রি করার নিয়ম

পুরাতন সোনা বিক্রি করলে কেন দাম কমে যায় তার একটা পরিষ্কার ধারণা এই আর্টিকেলটি পড়ে জানতে পারলাম। পাশাপাশি পুরাতন সোনা বিক্রি করার নিয়-ম খুব জটিল কিছু নয়, প্রয়োজন শুধু আপনার একটু সতর্কতা এবং সচেতনতার। সঠিক সময়ে বাজারদর জেনে সঠিক দোকানে এবং সঠিক নিয়মে বিক্রি করলে আপনি আপনার মূল্যবান সম্পদের সর্বোচ্চ ও সঠিক মূল্য পাওয়া সম্ভব।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

গ্রো কেয়ার আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url