কোরবানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মীয় নিয়ম ও মাসয়ালা-মাসায়েল
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম,
প্রিয় পাঠক- আসসালামু আলাইকুম, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা ২০২৬। আর এই ঈদুল আজহাকে বলা হয় কোরবানির ঈদ। এ ঈদে সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। কোরবানি ইসলাম ধর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা ঈদুল আজহার সময় পালন করা হয়।
তাই কোরবানি নিয়ে কিছু ধর্মীয় নিয়ম ও মাসয়ালা-মাসায়েল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা জানবো আজকের এই আলোচ্য আর্টিকেলটিতে।
পেজ সূচিপত্রঃ কোরবানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মীয় নিয়ম ও মাসয়ালা-মাসায়েল
- কোরবানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মীয় নিয়ম ও মাসয়ালা-মাসায়েল
- কার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব জেনে নিন মাসয়ালা
- কার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয় জেনে নিন মাসয়ালা
- কোরবানির পশুর বয়স ও দাঁতের নিয়ম কানুন সম্পর্কে জানুন
- যে সমস্ত পশু কোরবানি করা জায়েজ নয় তা জেনে রাখুন
- শরীকে কোরবানি দেওয়ার নিয়ম ও শরীক নির্বাচনের সতর্কতা সম্পর্কে মাসয়ালা দেখুন
- কোরবানির সঠিক তারিখ ও সময় - মাসয়ালা পড়ুন
- কোরবানির মাংস তিন ভাগে বণ্টন করার সঠিক ইসলামিক নিয়ম
- কোরবানির বিষয়ে আরো কিছু মাসয়ালা জেনে নিন
- কোরবানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মীয় নিয়ম ও মাসয়ালা-মাসায়েল
কোরবানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মীয় নিয়ম ও মাসয়ালা-মাসায়েল
কোরবানির বিধান আমাদের পূর্ববর্তী নবী-রাসুলগণের শরিয়তেও ছিল। যদিও পদ্ধতিগতভাবে ভিন্নতা ছিল। আমাদের শরিয়তে কোরবানি হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর মহান আত্মোৎসর্গের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রবর্তিত। এ ত্যাগের স্মরণে কোরবানি মুসলমানের জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অপার সুযোগ।
হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হলে মহান রব জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠিয়ে সেই আত্মত্যাগের পরীক্ষায় পূর্ণতা দেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত এই কোরবানিকে স্মরণীয় আমল হিসেবে অব্যাহত রাখেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর উম্মতকে কোরবানির পশুর গোশত খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা এই উম্মতের বিশেষ মর্যাদা। কোরবানির মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর কাছে কোরবানির দিনে কোরবানির চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই।
কেয়ামতের দিন কোরবানির পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে। আর পশুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। সুতরাং আনন্দচিত্তে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি) কোরবানি বছরে একবার করা হয়।
আর কোরবানি সংক্রান্ত এমন কিছু ধর্মীয় নিয়ম ও মাসয়ালা-মাসায়েল থাকে, যে সম্পর্কে সবার অবগতি থাকে না। তাই আজকে কোরবানির প্রয়োজনীয় মাসয়ালা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
কার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব জেনে নিন মাসয়ালা
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ যিলহজ্জ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নেসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হল- এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া।
আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব। *(আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫)
আবার, একান্নভুক্ত পরিবারের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাওয়া গেলে অর্থাৎ তাদের কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে তাদের প্রত্যেকের উপর ভিন্ন ভিন্ন কোরবানি ওয়াজিব।
পরিবারের যত সদস্যের উপর কোরবানি ওয়াজিব তাদের প্রত্যেককেই একটি করে পশু কোরবানি করতে হবে কিংবা বড় পশুতে পৃথক পৃথক অংশ দিতে হবে। একটি কোরবানি সকলের জন্য যথেষ্ট হবে না। *(বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২)
কার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয় জেনে নিন মাসয়ালা
- যে ব্যক্তি কোরবানির দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। *(ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫)
- নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কোরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে নফল কোরবানী করতে পারবে। *(বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬)
- নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এমন দরিদ্র ব্যক্তির উপর কোরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কোরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। *(বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২)
কোরবানির পশুর বয়স ও দাঁতের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জানুন
কোরবানির পশুর বয়স সম্পর্কে মাসয়ালা:
উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কোরবানি করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।
উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কোরবানি জায়েয হবে না। *(ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬)
উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কোরবানি করা জায়েয। অর্থাৎ কোরবানির পশুতে এক সপ্তমাংশ বা এর অধিক যে কোন অংশে অংশীদার হওয়া জায়েয। এক্ষেত্রে ভগ্নাংশ- যেমন, দেড় ভাগ, আড়াই ভাগ, সাড়ে তিন ভাগ হলেও কোনো সমস্যা নেই। *(সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩১৮; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭)
আর কোরবানির পশুর দাঁতের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে মাসয়ালা:
গরু-ছাগলের অধিকাংশ দাঁত না থাকলেও যে কয়টি দাঁত আছে তা দ্বারা যদি ঘাস চিবিয়ে খেতে পারে তবে সেটি দ্বারা কোরবানি সহীহ। কিন্তু দাঁত পড়ে যাওয়ার কারণে যদি ঘাস চিবিয়ে খেতে না পারে তবে ঐ পশু কোরবানি করা যাবে না। *(বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৫; ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/২৯৮)
যে সমস্ত পশু কোরবানি করা জায়েজ নয় তা জেনে রাখুন
- দাঁত নেই এমন পশু কোরবানি: যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না এমন পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। *(বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৫, আলমগীরী ৫/২৯৮)
- রুগ্ন ও দুর্বল পশু কোরবানি: এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কোরবানি করা জায়েয নয়। *(জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী ৫/২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪)
- কান বা লেজ কাটা পশু কোরবানি: যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কোরবানি জায়েয নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কোরবানি জায়েয। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। *(জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ ১/৬১০, ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ৫/২৯৭-২৯৮)
- যে পশুর শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেছে: যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে পশুর কোরবানি জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি সে পশু কোরবানি করা জায়েয। *(জামে তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪, আলমগীরী ৫/২৯৭)
- অন্ধ পশু কোরবানি: যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট সে পশু কোরবানি করা জায়েয নয়। *(জামে তিরমিযী ১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪)
- খোড়া পশু কোরবানি: যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কোরবানি জায়েয নয়। *(জামে তিরমিযী ১/২৭৫, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩, আলমগীরী ৫/২৯৭)
- গর্ভবতী পশু কুরবানি: গর্ভবতী পশু কোরবানি করা জায়েয। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কোরবানি করা মাকরূহ। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে এবং কেউ চাইলে এর গোশতও খেতে পারবে।*(কাযীখান ৩/৩৫০)
শরীকে কোরবানি দেওয়ার নিয়ম ও শরীক নির্বাচনের সতর্কতা সম্পর্কে মাসয়ালা দেখুন
একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কোরবানি দিতে পারবে। এমন একটি পশু দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে কোরবানি করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কোরবানি সহীহ হবে না। *(সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯, কাযীখান ৩/৩৪৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮)
জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন যে, আমরা একটি গরু এবং একটি উটে সাতজন করে শরীক হয়ে যাই। *(সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১২১৮)
কোরবানির সঠিক তারিখ ও সময় - মাসয়ালা পড়ুন
যিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কোরবানির সময়। তবে সবচেয়ে উত্তম হল প্রথম দিন কোরবানি করা। এরপর দ্বিতীয় দিন এরপর তৃতীয় দিন। *(বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫)
عن البراء عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : إن أول ما نبدأ به في يومنا هذا أن نصلي ثم نرجع فننحر، فمن فعل ذلك فقد أصاب سنتنا، ومن ذبح قبل فإنما هو لحم قدمه لأهله، ليس من النسك في شيء.
তাছাড়া, ১০ ও ১১ যিলহজ্ব দিবাগত রাতেও কোরবানি করা জায়েয। তবে দিনে কোরবানি করাই ভালো। *(মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩)
বারা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ঈদের দিন আমরা প্রথমে নামায আদায় করি। অতপর ফিরে এসে কোরবানি করি। যে ব্যক্তি এভাবে আদায় করবে সে আমাদের নিয়ম মতো করল। আর যে নামাযের আগেই পশু জবাই করল সেটা তার পরিবারের জন্য গোশত হবে, এটা কোরবানি হবে না।” *(সহীহ মুসলিম ২/১৫৪)
কোরবানির মাংস তিন ভাগে বণ্টন করার সঠিক ইসলামিক নিয়ম
কোরবানি দেওয়ার পর, এটি সুপারিশ করা হয় যে, কোরবানি দেওয়া ব্যক্তি মাংসটি নিম্নরূপে বিতরণ করবে:
- এক-তৃতীয়াংশ তার পরিবারের জন্য,
- এক-তৃতীয়াংশ প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের জন্য উপহার হিসেবে এবং
- এক-তৃতীয়াংশ দান হিসেবে গরীবদের জন্য।
এটি কোরআনুল কারিমের আয়াতের ওপর ভিত্তি করে, "তাহলে তাদের থেকে খান এবং অভাবী ও গরীবদের খাওয়ান" (আল-হজ্জ: ৩৬)।
ইবনু উমর (রাঃ) বলেছেন, "এক-তৃতীয়াংশ তোমার জন্য, এক-তৃতীয়াংশ তোমার পরিবার জন্য, এবং এক-তৃতীয়াংশ গরীবদের জন্য।"
রাসূল (সাঃ) বলেছেন, "আমি তোমাদের কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছিলাম যাতে সবাই কিছু পেতে পারে। এখন তুমি খেতে পার, অন্যদের দিতে পার এবং কিছু সংরক্ষণ করতে পার" (আহমদ)।
শরীকে কোরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়। *(আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১)
কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত নিজে রেখে দেওয়াও নাজায়েয নয়।*(বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০)
কোরবানি মাংসের কিছু অংশ দান হিসেবে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে ইসলামী আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। শাফি' এবং হাম্বলি মাযহাবের মতে কোরবানি মাংসের কিছু অংশ দান হিসেবে দেওয়া বাধ্যতামূলক, যেখানে মালিকি এবং হানাফি মাযহাব এটি সুপারিশকৃত, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
কোরবানির বিষয়ে আরো কিছু মাসয়ালা জেনে নিন
- চুল-নখ না কাটা: উম্মে সালামাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, “তোমাদের মধ্যে যারা কোরবানি দেওয়ার এরাদা রাখে, তারা যেন যিলহজ্জ মাসের চাঁদ ওঠার পর হ’তে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত স্ব স্ব চুল ও নখ কর্তন করা হ’তে বিরত থাকে”। *(মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৫৯; নাসাঈ, মির‘আত হা/১৪৭৪-এর ব্যাখ্যা, ৫/৮৬।)
- ‘মুসিন্নাহ’ দ্বারা কোরবানি: রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘তোমরা দুধের দাঁত ভেঙ্গে নতুন দাঁত ওঠা (মুসিন্নাহ) পশু ব্যতীত যবহ করো না। তবে কষ্টকর হ’লে এক বছর পূর্ণকারী ভেড়া (দুম্বা বা ছাগল) কোরবানি করতে পার’। *(মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৫৫; নাসাঈ তা‘লীক্বাত সহ (লাহোর ছাপাঃ তারিখ বিহীন), ২/১৯৬ পৃঃ।)
জমহূর বিদ্বানগণ অন্যান্য হাদীছের আলোকে এই হাদীছে নির্দেশিত ‘মুসিন্নাহ’ পশুকে কোরবানির জন্য ‘উত্তম’ হিসাবে গণ্য করেছেন। *(মির‘আত (লাক্ষ্ণৌ) ২/৩৫৩ পৃঃ; ঐ, (বেনারস) ৫/৮০ পৃঃ।)
‘মুসিন্নাহ’ পশু ষষ্ঠ বছরে পদার্পণকারী উট এবং তৃতীয় বছরে পদার্পণকারী গরু বা ছাগল-ভেড়া-দুম্বাকে বলা হয়। *(মির‘আত, ২/৩৫২ পৃঃ; ঐ, ৫/৭৮-৭৯ পৃঃ) কেননা এই বয়সে সাধারণতঃ এই সব পশুর দুধের দাঁত ভেঙ্গে নতুন দাঁত উঠে থাকে। তবে অনেক পশুর বয়স বেশী ও হৃষ্টপুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সঠিক সময়ে দাঁত ওঠে না। এসব পশু দ্বারা কোরবানি করা ইনশাআল্লাহ কোন দোষের হবে না।
- কোরবানি ও আক্বীক্বা: ‘কোরবানি ও আক্বীক্বা দু’টিরই উদ্দেশ্য আল্লাহর নৈকট্য হাছিল করা’ এই (ইসতিহসানের) যুক্তি দেখিয়ে কোন কোন হানাফী বিদ্বান কেরবানির গরু বা উটে এক বা একাধিক সন্তানের আক্বীক্বা সিদ্ধ বলে মত প্রকাশ করেছেন (যা এদেশে অনেকের মধ্যে চালু আছে)। *(বুরহানুদ্দীন মারগীনানী, হেদায়া (দিল্লী : ১৩৫৮ হিঃ) ‘কুরবানী’ অধ্যায় ৪/৪৩৩; আশরাফ আলী থানভী, বেহেশতী জেওর (ঢাকা : এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ১০ম মুদ্রণ ১৯৯০) ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায় ১/৩০০ পৃঃ।)
হানাফী মাযহাবের স্তম্ভ বলে খ্যাত ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ) এই মতের বিরোধিতা করেন। ইমাম শাওকানী (রহঃ) এর ঘোর প্রতিবাদ করে বলেন, এটি শরী‘আত, এখানে সুনির্দিষ্ট দলীল ব্যতীত কিছুই প্রমাণ করা সম্ভব নয়। *(নায়লুল আওত্বার, ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায় ৬/২৬৮ পৃঃ।)
- কোরবানির বদলে তার মূল্য ছদাক্বা: কোরবানির বদলে তার মূল্য ছদাক্বা করা নাজায়েয। আল্লাহর রাহে রক্ত প্রবাহিত করাই এখানে মূল ইবাদত। যদি কেউ কোরবানির বদলে তার মূল্য ছদাক্বা করতে চান, তবে তিনি মুহাম্মাদী শরী‘আতের প্রকাশ্য বিরোধিতা করবেন। *(মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়াহ, ২৬/৩০৪; মুগনী, ১১/৯৪-৯৫ পৃঃ।)
- কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা: কুরবানীর চামড়া কোরবানিদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি। *(আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১)
- কাজের লোককে কোরবানির মাংস খাওয়ানো: কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। মাংস পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও মাংস খাওয়ানো যাবে। *(আহকামুল কুরআন জাস্সাস ৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলবাহরুর রায়েক ৮/৩২৬, ইমদাদুল মুফতীন)
পোস্টের শেষ-কথাঃ কোরবানি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধর্মীয় নিয়ম ও মাসয়ালা-মাসায়েল
পরিষেশে, আমরা বলতে পারি যে, এটি শুধুমাত্র ঈদুল আজহার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও ইসমাইল (আঃ)-এর আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠা ও আনুগত্যের এক জীবন্ত স্মরণ। কোরবানির সময় দোয়া, নিজ হাতে কোরবানি, পশুর সঙ্গে সদাচরণ এবং নিয়তের বিশুদ্ধতা - মিলিয়ে এটি এক অনন্য আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ্য।
সর্বোপুরি, এই ইবাদতের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা বাড়ানো এবং আত্মত্যাগের চেতনা জাগ্রত করা। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অন্তরে ধারণ করে আন্তরিকতার সঙ্গে এই ইবাদত পালন করা। পরিশেষে, আল্লাহ তায়ালা সবার কোরবানিকে কবুল করুক, এই দোয়া করি। আমিন।

গ্রো কেয়ার আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url