দেশি বিড়ালের যত্ন কিভাবে নিতে হয় -বিস্তারিত আলোচনা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম,
প্রিয় পাঠক- আসসালামু আলাইকুম, আপনি যদি আপনার বাসায় কোন দেশি বিড়াল ছানা পোষতে বা লালন-পালন করতে চান, তাহলে প্রথমেই আপনাকে দেশি বিড়ালের বা বিড়াল ছানার যত্ন ও সঠিক পরিচর্যা সম্পর্কে জানতে হবে।

দেশি-বিড়ালের-যত্ন-কিভাবে-নিতে-হয়--বিস্তারিত-আলোচনা

যার মাধ্যমে আপনি আপনার আদরের বিড়াল ছানাকে উপহার দিতে পারবেন সুন্দর একটি জীবন। তাই আজকে আমাদের আলোচ্য আর্টিকেলটিতে আলোচনার বিষয়বস্তু হলো- ‘দেশি বিড়ালের যত্ন কিভাবে নিতে হয় -বিস্তারিত আলোচনা,

পেজ সূচিপত্রঃ দেশি বিড়ালের যত্ন কিভাবে নিতে হয় -বিস্তারিত আলোচনা

দেশি বিড়ালের যত্ন কিভাবে নিতে হয় -বিস্তারিত আলোচনা

শখের বশে আমরা অনেকে বিড়াল পোষে থাকি। প্রাণীটি খুব আদুরে স্বভাবের এবং সহজেই পোষ মানে বলে পোষা প্রাণীর মধ্যে বিড়াল আমাদের প্রথম পছন্দ।

সাধারণভাবেই বিড়াল পালন বা পোষা খুবই আনন্দের বিষয় যা অবশ্যই দায়িত্বপূর্ণ। কারণ, তাদের স্বাস্থ্যের যত্ন, সঠিক খাদ্যতালিকা, পরিচ্ছন্নতা,  শারীরিক ও মানসিক ভালো রাখতে আপনাকে সচেষ্ট হতে হবে।

দেশি-বিড়ালের-যত্ন-কিভাবে-নিতে-হয়

বিড়াল পোষার শখ নতুন কিছু নয়, প্রাচীনকাল থেকে মানুষজন বাসা-বাড়িতে এই প্রাণীটি পোষে আসছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশে বিড়াল পোষার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে আর সেই সাথে বাড়ছে বিড়ালকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়, কিভাবে তার যত্ন নিতে হয় সেই বিষয়ে জানার আগ্রহ।

তাই আজকের এই আর্টিকেলটিতে দেশি বিড়ালের যত্ন কিভাবে নিতে হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

দেশি বিড়ালের সঠিক স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা সম্পর্কে জেনে রাখুন

সুস্বাস্থ্য দেহের বিড়াল মানেই একটা সুখী বিড়াল। আর আপনার বিড়ালের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অনেকটা নির্ভর করে আপনার যত্ন ও পরিচর্যার উপর। বিড়াল, আমাদের প্রিয় পোষা প্রাণী কেবল সঙ্গীই নয় বরং পরিবারের এক সদস্য। তাদের সুস্বাস্থ্য এবং সুখ নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। বিড়ালের সুস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচর্যার জন্য সঠিক তথ্য ও যত্ন প্রয়োজন, যা তাদের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করবে।

দেশি-বিড়ালের-সঠিক-স্বাস্থ্য-ও-পরিচর্যা

তাছাড়া, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, নিয়মিত চেকআপ এবং সঠিক যত্নের মাধ্যমে আমরা আমাদের বিড়ালের জন্য একটি নিরাপদ ও সুখী পরিবেশ তৈরি করতে পারি। আসুন, জেনে নিই কীভাবে আমাদের পছন্দের এই প্রাণীটির যত্ন নিতে হবে।

  • প্রথমেই বিড়ালকে গ্রুমিং করানোঃ নিয়ম করে যেকোন বিড়ালকে- হোক দেশি অথবা পারসিয়ান গ্রুমিং করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে বিড়ালের কান ও চোখের যত্ন নেয়া উচিৎ। বিড়ালের চোখ নিয়মিত পরিষ্কার না করানো হলে ময়লা জমে বিড়ালের চোখের কর্নিয়াতে নানান ধরনের রোগ হতে পারে। এজন্য বিড়ালের যত্নে অবশ্যই তার চোখ ও কান প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার পরিষ্কার করবেন।

বিড়ালের গ্রুমিং আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাকে গোসল করানো। বিড়ালকে নিয়ম করে গোসল না করানো হলে তার শরীরে উকুন হওয়ার সম্ভবনা থেকে যায়। এছাড়াও অতিরিক্ত গরমের মধ্যে গোসল না করানো হলে শরীর তেল চিটচিটে হয়ে যেতে পারে এবং আপনার বিড়াল অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে।

বিড়ালের গোসল করানোর সময় একটা দিক যা অবশ্যই মাথায় রাখা প্রয়োজন তা হলো- বিড়ালদের জন্য আলাদা শ্যাম্পু পাওয়া যায়। আপনার উচিৎ বিড়ালের জন্য তৈরি করা শ্যাম্পু ব্যাবহার করতে। এতে করে বিড়ালের লোমের কোন ক্ষতি হবে না।

অন্যদিকে, শীতকালে বিড়ালের গোসল করানো একেবারেই উচিৎ নয়। কেননা শীতকালে বিড়ালদের ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা সব থেকে বেশি থাকে। আর ঠান্ডা লেগে ফ্লু হতে পারে। তাই অবশ্যই বিড়ালের যত্নে শীতকালে গোসল করানো এড়িয়ে চলবেন।

  • দেশি বিড়ালকে যা যা খাওয়াবেনঃ বিড়ালের সঠিক খাবার নির্বাচন একটা বিড়ালের সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরী ভূমিকা পালন করে। বিড়ালের জন্য উন্নতমানের ও ব্র্যান্ডের খাবার খাওয়ানো উচিৎ। কেননা খোলা খাবারে সঠিক পুষ্টি চাহিদা সম্পন্ন হয়না।
আপনার উচিৎ, আপনার বিড়ালের সঠিক যত্ন ও পরিচর্যা নিশ্চিতে আপনি ক্যাটফুড খাওয়াবেন পাশাপাশি তাদের মাঝে মাঝে ওয়েট ফুড দিবেন এতে সুষম মান বজায় থাকবে ও আপনার বিড়াল ভালো ও সুস্থ থাকবে।

  • বিড়ালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাঃ আমাদের দেশে প্রতিবছর বহু বিড়াল মারা যায়, এমনকি প্রতিমাসে শতশত বিড়াল বাসা থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় এবং তারা আর ফিরে আসে না, বাসায় পালিত বিড়াল আদরে থাকে।
আমাদের আদরের পোষা প্রাণীর নিরাপত্তা নিয়ে আমরা প্রায় সকলেই অনেক দুশ্চিন্তায় থাকি। বিশেষ করে তারা যদি কোন ভাবে হারিয়ে যায় তবে আমরা তাদের কিভাবে খুঁজে বের করবো এই চিন্তা সবচাইতে বেশি থাকে। তাই তাদের নিরাপত্তার জন্য সবরকম ব্যবস্থা করা।

  • বিড়ালের ভ্যাক্সিনেশনঃ বিড়ালের যত্নে অত্যন্ত জরুরী একটা বিষয় হলো তাকে নিয়মিত ভ্যাক্সিনেশন করানো। আর ভ্যাকসিন হলো আপনার প্রিয় পেটের অর্থাৎপোষা বিড়ালের সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার একটি অপরিহার্য উপায়।
বিড়ালের সুস্থ ভাবে দীর্ঘদিন বাঁচার জন্য তাকে যে টিকা দেয়া হয়ে থাকে সেটাকেই বিড়ালের ভ্যক্সিন বলে থাকে। বিড়ালের কিছু রোগ আছে যা মানুষের মাঝে সংক্রমণ ঘটায় যেমন র‍্যাবিস, এ ধরনের রোগ থেকে আপনার বিড়াল ও নিজেদের সুস্থ রাখতে বিড়ালের ভ্যাক্সিনেশন করানো উচিৎ। 

বিড়ালদের রোগ প্রতিরোধ করার জন্য অনেক ধরনের ভ্যাকসিন রয়েছে, বর্তমানে আমাদের দেশে
টি ভ্যাকসিন বেশি দেওয়া হয়ে থাকে।

👉১. NOBIVAC Feline 1-HCPCh: Feline Calicivirus (FCV) (cat flu /বিড়ালের জ্বর, Feline Rhinotracheitis (নিউমোনিয়া এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা), Feline Panleukopenia (FPV), Feline Chlamydophila

👉২. RABISIN: জলাতঙ্ক বিড়ালের একটি মারাত্মক এবং প্রানঘাতী সংক্রামক রোগ। Rabisin vaccine বিড়ালকে জলাতঙ্ক (rabies) রোগ থেকে রক্ষা করে।এটি ৩বছর, ১বছর, ৬মাস বিভিন্ন মেয়াদী হয়ে থাকে।

👉৩. QUADRICAT: Quadricat vaccine বিড়ালকে calicivirus , rhinotracheitis, panleukopenia এবং rabies থেকে রক্ষা করে।
  • পরিষ্কার জায়গার ব্যবস্থা করাঃ বিড়াল নিজে পরিষ্কার থাকতে যেমন পছন্দ করে ঠিক তেমন ভাবে পরিষ্কার স্থানে থাকতে পছন্দ করে। হোক সে দেশি বা পারসিয়ান। ময়লা স্থানে বিড়াল একেবারেই থাকতে চায় না । তাই আপনার আদরের পোষা বিড়ালের জন্য পরিষ্কার স্থানের ব্যাবস্থা করে দিতে হবে আপনাকে।
  • বিড়ালের জন্য লিটার বক্সের ব্যবস্থা করাঃ যারা বাড়িতে দেশি বিড়াল পোষেন বা লালন-পালন করেন তাদের অনেকেই Cat Litter এর সাথে পরিচিত।
বিড়ালের টয়লেট হিসেবে বালুর পরিবর্তে Cat Litter ব্যাবহার করা যায়।  এটি ছোট ছোট দানার মত অথবা ছোট পাথরের মত সাদা রঙের হয়ে থাকে।

সহজে পরিস্কার করা যায় এবং গন্ধ মুক্ত রাখে বলে বিড়ালপ্রেমীদের মধ্যে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একটি বয়স্ক বিড়ালের জন্য ৫ লিটার দিয়ে ২৫-৩০দিন পর্যন্ত চলে। 

আরো পড়ুনঃ

দেশি বিড়াল পোষার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে জানুন

  • বিড়াল পোষা বা লালন-পালনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল একাকীত্ব দূর করা। বিড়াল আপনার বন্ধুসুলভ আচরণ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে তাই সে তা ফেরতও দিতে পারে। বিড়ালের যত্ন নিতে নিতে আপনি অন্যদের প্রতিও যত্নশীল হয়ে উঠবেন। যেহেতু বিড়াল কম খাবার খায় তাই কম খরচে একটি ভালো সঙ্গী পাবেন।

দেশি-বিড়াল-পোষার-উপকারিতা-ও-অপকারিতা

  • বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, বিড়াল পোষলে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে যার প্রভাব শারীরিকভাবেও দেখা যায়। এছাড়াও একটি ছোট্ট গলু-মলু আদুরে বিড়াল আপনাকে স্মার্টও করে তুলবে।
  • বিড়াল পালনের তেমন কোন অপকারিতা নেই। তবে একে বাইরের পশুর সাথে মিশতে দেয়া উচিত নয় কারন এতে রোগ-জীবাণু ছড়াতে পারে। 
  • বিড়ালকে যদি টিকা দেয়া না হয় তাহলে তার আঁচড় ও কামড়ে জলাতঙ্ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদিও পোষা বিড়াল সাধারনত আক্রমনাত্বক হয় না। এছাড়াও প্রায় সব ধরনের বিড়ালের লালা ও মলমূত্রে টকশোপ্লাজমসিস নামক জীবাণু থাকে যা মানবদেহে সংক্রমিত হতে পারে।

দেশি বিড়াল পোষতে বা লালন-পালন করতে কেমন খরচ হতে পারে তা জেনে নিন

দেশি বিড়াল পোষতে বা লালন-পালন করতে কত টাকা খরচ হতে পারে তা বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যেমনঃ আপনি কী ধরনের খাবার দিচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে মাসে আনুমানিক ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা খরচ হতে পারে।

টিকা, গ্রুমিং ইত্যাদির জন্য বাৎসরিক প্রায় ৩০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা লাগতে পারে। বিড়ালের থাকার জায়গা তৈরি, বিছানা, এবং খেলনা বাবদ এককালীন ৪০০০ টাকার মত খরচ হতে পারে। লিটার বক্সের অনেক ধরন রয়েছে তবে প্রতি মাসে লিটার বক্স ও লিটার এর জন্য ৫০০ থেকে ৭০০০ টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

এই সব খরচ বাদে আপনার বাজেটে আরো কিছু টাকা বরাদ্দ রাখা উচিত অপ্রত্যাশিত খরচের জন্য। 
আপনার রুচি ও বিড়ালের জাতের উপর নির্ভর করে এই খরচ কমবেশি হতে পারে। আপনার প্রিয় বিড়ালের যত্নে আরোগ্য আছে আপনার পাশে।

বিড়াল সংবেদনশীল প্রানী। তাই এর জন্য প্রয়োজনীয় রেডি ফুড, গ্রুমিং এর জিনিসপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জামের কোয়ালিটি ভালো হওয়া অনেক জরুরী। তবে ভালো ব্র্যান্ড ও কোয়ালিটির ভিত্তিতে খরচ বেড়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন ও উত্তরঃ দেশি বিড়ালের যত্ন কিভাবে নিতে হয় -বিস্তারিত আলোচনা

প্রশ্নঃ নতুনদের জন্য দেশি না বিদেশী বিড়াল পোষা ভালো?
উত্তরঃ আপনি যদি বিড়াল পোষতে বা লালন-পালনে একেবারে নতুন হন তাহলে দেশি জাতের বিড়াল ভালো হবে। কারন দেশি বিড়ালের তুলনামূলক কম যত্নের প্রয়োজন হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশী থাকে।

প্রশ্নঃ বিড়াল থেকে সাধারণত কি কি রোগ জীবানু ছড়ায়?
উত্তরঃ
  • সুস্থ ও অসুস্থ সব ধরনের বিড়ালের লালা ও মলমূত্রে টকশোপ্লাজমসিস নামে এক ধরনের জীবাণু পাওয়া যায় যা গর্ভবতী নারীদের জন্য ক্ষতিকর।
  • এই জীবাণু বিড়ালের শরীরেও লেগে থাকতে পারে যা খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে মানবদেহে সংক্রমিত হতে পারে। 
প্রশ্নঃ পোষা বিড়ালকে কি ভ্যাকসিন দেওয়া খুবই জরুরি?
উত্তরঃ অবশ্যই বিড়ালের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ভ্যাকসিন দেওয়া খুবই জরুরি। আপনি আপনার পোষা বিড়ালকে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন দিন।

প্রশ্নঃ বাসায় পোসা বিড়ালকে কি গোসল করানো উচিত?
উত্তরঃ হ্যাঁ,  বিড়াল সাধারণত নিজেরাই নিজেদের পরিষ্কার রাখে। তবে, প্রয়োজনে আপনি তাদের হালকা গরম জল দিয়ে গোসল করাতে পারেন। বিড়ালের জন্য তৈরি শ্যাম্পু ব্যবহার করুন এবং গোসলের পর ভালোভাবে শরীর মুছে দিন।

প্রশ্নঃ আপনার বিড়ালের স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায়গুলো কি কি?
উত্তরঃ আপনি আপনার বিড়ালের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য তাদের নিয়মিত পশুচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান এবং তাদের সঠিক খাবার দিন। এছাড়াও, তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন এবং তাদের সাথে খেলাধুলা করুন। তবেই বিড়ালের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

গ্রো কেয়ার আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url